Table of Contents
বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তার লেখনীতে মিশে থাকত জীবনের সাধারণ গল্প, গভীর আবেগ, আর অপূর্ব কল্পনা, যা পাঠকদের মনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছে। তার কন্যা শীলা আহমেদও একসময় চলচ্চিত্র ও নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। তবে ব্যক্তিগত কারণে তিনি অভিনয় জগৎ থেকে সরে এসে এখন তার বাবার স্মৃতি ও লেখালেখির প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। সম্প্রতি শীলা আহমেদ তার বাবার জীবন, লেখার ধরন এবং স্মৃতিচারণ নিয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, তা পাঠকদের মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই লেখায় আমরা হুমায়ূন আহমেদের জীবনের বিভিন্ন দিক এবং শীলার দৃষ্টিকোণ থেকে তার বাবার প্রতি একটি বিশদ আলোচনা তুলে ধরব।
হুমায়ূন আহমেদের লেখার ধরন ও পরিবেশ
হুমায়ূন আহমেদের লেখার ধরন ছিল অনন্য। শীলা আহমেদ জানিয়েছেন, তার বাবা কখনো নিরিবিলি পরিবেশে লিখতে পছন্দ করতেন না। অনেক লেখক যেখানে নিস্তব্ধতা খুঁজতেন, সেখানে হুমায়ূন আহমেদের জন্য প্রাণবন্ত পরিবেশই ছিল সৃষ্টিশীলতার উৎস। তিনি হইচই, আড্ডা, আর মানুষের কোলাহলের মধ্যেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। শীলার ভাষ্যমতে, “বাবা লেখার সময় ঘরময় পায়চারি করতেন। এক হাতে সিগারেট, আরেক হাতে চায়ের কাপ—এই ছিল তার সঙ্গী। প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর তিনি চা চাইতেন।” এই অভ্যাসগুলো তার লেখার প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছিল।

লেখা শেষ হলে হুমায়ূন আহমেদ নিজে কখনো তা পড়ে দেখতেন না। তিনি পরিবারের সদস্যদের দিয়ে পড়াতেন এবং তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝতে চাইতেন তার লেখা কতটা সফল। শীলা বলেন, “বাবা খুশি হতেন যদি তার লেখা পড়ে কেউ কাঁদত। কিন্তু কেউ যদি না কাঁদত, তিনি রীতিমতো রেগে যেতেন। তিনি চাইতেন তার লেখা পাঠকের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটুক।” এই আবেগপ্রবণতাই হুমায়ূন আহমেদকে অন্য লেখকদের থেকে আলাদা করেছে।
পাঠকের মনে মায়ার জাদু
হুমায়ূন আহমেদের প্রতিটি উপন্যাসে একটি বিশেষ মায়া ছিল, যা পাঠকদের আবেগের গভীরে টেনে নিত। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো—মিসির আলি, হিমু, বা রূপা—এতটাই জীবন্ত যে পাঠকরা তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ত। শীলা আহমেদ বলেন, “ছোটবেলায় বাবার লেখা পড়ে মনে হতো, আমি তার মেয়ে বলেই হয়তো এতটা টান অনুভব করি। কিন্তু বড় হওয়ার পর দেখলাম, বাবার প্রতিটি পাঠকই তার চরিত্রগুলোর প্রতি একই মায়া অনুভব করেন।”
তার লেখায় সাধারণ মানুষের জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো এমনভাবে ফুটে উঠত যে পাঠকরা নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতেন। শীলার মতে, “বাবার লেখার মধ্যে একটা অদ্ভুত টান ছিল। তার প্রতিটি গল্প পড়লে মনে হতো, এই চরিত্রগুলো আমার চেনা, আমার জীবনেরই অংশ।” এই গুণই হুমায়ূন আহমেদকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখেছে।
একজন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা
হুমায়ূন আহমেদের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। তিনি কখনো নিজের খ্যাতি বা সাফল্য নিয়ে অহংকার করতেন না। শীলাকে তিনি সবসময় বলতেন, “তোমার পরিচয় যেন শুধু হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে হওয়া না হয়। নিজের পরিচয় নিজে তৈরি করো।” এই শিক্ষা শীলার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, “বাবা চাইতেন আমরা নিজেদের যোগ্যতায় বড় হই, তার ছায়ায় না।”
তবে জীবনের শেষ দিকে তার বন্ধুমহলে কিছুটা পরিবর্তন এসেছিল। শীলার মতে, “শুরুর দিকে বাবা সমালোচনা গ্রহণ করতেন। তিনি তার লেখা নিয়ে আলোচনা পছন্দ করতেন। কিন্তু শেষের দিকে তার চারপাশে এমন কিছু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, যারা তার প্রতিটি কথা ও সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মেনে নিতেন।” শীলা মনে করেন, এই পরিবেশ তার বাবাকে কিছুটা ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। তিনি আরও বলেন, “বাবা সবসময় সৎ মতামত চাইতেন, কিন্তু শেষ দিকে তিনি তা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।”
বাবার মৃত্যু: এক আবেগঘন স্মৃতি
হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু এবং তার মরদেহ দেশে ফেরানোর স্মৃতি শীলার জন্য সবচেয়ে আবেগপ্রবণ মুহূর্ত। তিনি বলেন, “আমি বাবার মুখটা খুব বেশি মনে করতে পারি না। কিন্তু সেই দিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে, যখন তার কফিন বিমান থেকে নামানো হচ্ছিল।” সেদিন বিমানবন্দরে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছিল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, ফুলে সাজানো লাশবাহী গাড়ি, আর চারপাশের কোলাহল এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছিল।
শীলা আরও বলেন, “সেদিন আমার পাশেই আরেকটি কফিন ছিল। হয়তো সেখানেও একজন মেয়ে তার বাবাকে হারিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল, তার কাছে গিয়ে বলি—এই সব আয়োজন, ভিড়, ফুলের মালা—কিছুরই কোনো মূল্য নেই। কারণ প্রিয়জন হারানোর বেদনা আমাদের সবার জন্য একই।” এই কথাগুলো শুধু তার ব্যক্তিগত ক্ষত নয়, বরং একটি সর্বজনীন সত্যকে তুলে ধরে।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক অবদান
হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। তার লেখায় গ্রামীণ জীবন, শহুরে জটিলতা, আর মানুষের সাধারণ আবেগের মিশেল ছিল। ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘লীলাবতী’, ‘মিসির আলি’ সিরিজ, ‘হিমু’ সিরিজ—এই সব কাজ তার অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে। তিনি শুধু উপন্যাসই লেখেননি, নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমেও দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’—এই সিনেমাগুলো তার সৃষ্টিশীলতার আরেকটি দিক প্রকাশ করে।
তার লেখার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সরলতা। তিনি জটিল বিষয়গুলোকে এমন সহজভাবে উপস্থাপন করতেন যে সাধারণ পাঠক থেকে শিক্ষিত সমাজ—সবাই তার লেখায় নিজেকে খুঁজে পেত। শীলা বলেন, “বাবার লেখা পড়লে মনে হতো, তিনি আমাদের জন্যই লিখছেন। তার গল্পে কোনো দূরত্ব ছিল না।”
শীলা আহমেদের জীবন ও বাবার প্রভাব
শীলা আহমেদ নিজেও একসময় অভিনয় জগতে পা রেখেছিলেন। তিনি বাবার নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে তিনি এই জগৎ থেকে সরে আসেন। বর্তমানে তিনি তার বাবার স্মৃতি ও কাজ নিয়ে কথা বলছেন, যা পাঠকদের কাছে নতুন করে হুমায়ূন আহমেদকে চেনার সুযোগ করে দিচ্ছে। শীলার কথায়, “বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু বাবা-মেয়ের ছিল না। তিনি আমার শিক্ষক, বন্ধু, আর অনুপ্রেরণা ছিলেন।”
উপসংহার
হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আবেগের নাম। তার লেখার মাধ্যমে তিনি পাঠকদের হৃদয়ে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছেন। শীলা আহমেদের স্মৃতিচারণ তার বাবার জীবনের অজানা দিকগুলো তুলে ধরেছে। তার কথাগুলো শুধু একজন কন্যার স্মৃতি নয়, বরং একজন মহান সাহিত্যিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ। হুমায়ূন আহমেদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি চরিত্র আজও পাঠকদের মনে জীবন্ত। তিনি চলে গেলেও তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে চিরকাল আলো ছড়িয়ে যাবে।
NG Videos news এর সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।