ভাবতে পারেন, একজন শিক্ষক যিনি নিজেই কলেজের গণ্ডি পার হননি, তিনি টানা ৪৩ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন? অবাক লাগলেও এমনই এক অবিশ্বাস্য ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে নেত্রকোনার খালিয়াজুরিতে!
অভিযুক্ত এই শিক্ষকের নাম মো. আব্দুল মোনায়েম। তিনি উপজেলার নূরপুর বোয়ালী দাখিল মাদ্রাসার এবতেদায়ি শাখার জুনিয়র শিক্ষক। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে চাকরি করলেও, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি এইচএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক) পাশই করেননি! শুধু তাই নয়, চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তার বয়স ১৭ বছরও ছিল না!
ঘটনার আদ্যোপান্ত ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ: সম্প্রতি মো. কাজী আলম নামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেই অভিযোগপত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য!
- অপ্রাপ্ত বয়সে নিয়োগ: ১৯৮৩ সালের ২ নভেম্বর তিনি যখন চাকরিতে যোগ দেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর ১০ মাস!
- পরীক্ষায় ফেল ও ফাঁকিবাজি: ১৯৯২ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে তাকে এইচএসসি পাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৯৯৪ ও ১৯৯৬ সালে পরীক্ষা দিলেও তিনি পাশ করতে পারেননি। এমনকি ১৯৯৮ সালে পরীক্ষার কথা বলে ছুটি নিলেও শেষ পর্যন্ত আর পরীক্ষাই দেননি!
- ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ: কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতিই নয়, এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে রয়েছে অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ। শিক্ষক প্রতিনিধি থাকাকালে স্বাক্ষর জাল করে প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলাও হয়।
কী বলছেন অভিযুক্ত শিক্ষক? এসব অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক আব্দুল মোনায়েমের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি জানান, ১৯৮৩ সালে যখন তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে শুধু এসএসসি পাশের যোগ্যতাই চাওয়া হয়েছিল। তাই তার এইচএসসি সনদের কোনো প্রয়োজন ছিল না। অপ্রাপ্ত বয়সে চাকরির বিষয়ে তার ভাষ্য, “তৎকালীন মাদ্রাসা কমিটি আমাকে নিয়োগ দিয়েছে, আমি তো আর নিজে নিয়ম তৈরি করে চাকরিতে ঢুকিনি!” এছাড়া অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অভিযোগও তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: মাদ্রাসার সুপার মো. হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, মোনায়েমকে বারবার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলা হলেও তিনি তা ব্যক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে গেছেন। এমনকি ২০২৫ সালে বিনা অনুমতিতে দুই মাসের বেশি সময় মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থাকায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছিল, যার জন্য তিনি পরে ক্ষমা চান।
খালিয়াজুরির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান জানিয়েছেন, অভিযোগটি তারা হাতে পেয়েছেন এবং একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। সত্যতা মিললে অবশ্যই কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যেখানে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক একটি চাকরির জন্য দিনের পর দিন লড়াই করছেন, সেখানে এমন ঘটনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কোন চিত্র তুলে ধরে? এই পুরো বিষয়টি নিয়ে আপনার মতামত কী? কমেন্টে জানাতে পারেন!






