গল্প বা সিনেমার প্লটকেও যেন হার মানায় বাস্তবের কিছু জীবনসংগ্রাম। একটু কল্পনা করুন—বিকেলে জন্মদাতা বাবার লাশ দাফন করেছেন এক তরুণ। অভাবের সংসার, তাই শোক পালনের ফুরসত নেই। রাতেই তাকে ছুটতে হয়েছে এটিএম বুথে সিকিউরিটি গার্ডের ডিউটি পালন করতে। সারা রাত নির্ঘুম ডিউটি শেষে পরদিন সকালেই আবার বসেছেন এইচএসসি (HSC) পরীক্ষার সিটে!
অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি কোনো গল্প নয়, বাগেরহাটের লড়াকু তরুণ ইকনের জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। আর এই অদম্য তরুণের হার না মানা সংগ্রামের গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এবার তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন স্বয়ং শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
যেভাবে এলো সুখবর: ইকনের এই মর্মস্পর্শী খবরটি ভাইরাল হওয়ার পর তা শিক্ষামন্ত্রীর নজরে আসে। তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন। বুধবার (২২ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ফারহান ইশতিয়াক ফোনে কথা বলেন ইকনের সঙ্গে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী নিজেই ইকনের সঙ্গে কথা বলবেন।
ইতিমধ্যেই ইকনের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। সবচেয়ে বড় সুখবর হলো—এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ইকনের উচ্চশিক্ষাসহ ভবিষ্যতের সার্বিক লেখাপড়ার পুরো দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
ইকনের পাহাড়সম কষ্টের কথা: ইকনের পরিবারের গল্পটা শুনলে যে কারও চোখ ভিজে আসবে। বড় ভাই এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে ভারসাম্যহীন হয়ে গেছেন, মা তাকেই দেখাশোনা করেন। সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন তার বাবা। হঠাৎ করে সেই বাবা চলে যাওয়ায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে ইকনের মাথায়।
অভাবের কারণে এ বছর এইচএসসির প্রয়োজনীয় বইগুলোও ঠিকমতো কিনতে পারেননি তিনি। তবু হাল ছাড়েননি। নিজের চেষ্টায় ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিখেছেন কোরিয়ান ও চীনা ভাষাও। বাবার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া ইকন বলেন, “বাবাকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। যার বাবা নেই, সেই-ই বোঝে এই বেদনা। বাবা ছিলেন আমাদের জীবনের বটগাছ।”
কৃতজ্ঞতা ও নতুন স্বপ্ন: শিক্ষামন্ত্রীর এমন মানবিক উদ্যোগে যেন অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আলোর দেখা পেয়েছেন ইকন। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “আমি স্বপ্নেও ভাবিনি আমার জীবনের গল্প এভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে। শিক্ষামন্ত্রী স্যার আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা শুনে আমি নতুন করে বাঁচার সাহস পেয়েছি।”
যে তরুণের চোখেমুখে একদিন দারিদ্র্যের কষাঘাতে স্বপ্ন ভাঙার ভয় ছিল, আজ পুরো দেশ তার পাশে দাঁড়িয়েছে। যারা ইকনের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন, সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। সবার কাছে শুধু একটাই দোয়া চেয়েছেন—লেখাপড়া শেষ করে যেন তিনি একজন ভালো মানুষ হতে পারেন এবং অসহায় পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারেন।
ইকনের এই সংগ্রাম আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল—পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো কিছুই মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারে না। ইকনের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা!






